এক বছর আগেও ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশীরা সবচেয়ে বেশি ব্যয় করতেন ভারতে। কিন্তু ভিসা জটিলতার কারণে শীর্ষ এ গন্তব্যে পরিবর্তন এসেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে দেশের ব্যাংকগুলোর ইস্যু করা কার্ড ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে। এক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান নেমেছে তৃতীয় স্থানে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা কার্ডভিত্তিক লেনদেনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের এপ্রিলে তিন ধরনের কার্ড ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীরা মোট ৮৬৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১১৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, যা মোট ব্যয়ের ১৩ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা যুক্তরাজ্যে ব্যয় হয়েছে ৮৭ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ১০ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। আর এপ্রিলে বাংলাদেশী কার্ডধারীরা প্রতিবেশী ভারতে ব্যয় করেছেন ৬৯ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে ভারতে ব্যয় হয়েছে মোট ব্যয়ের ৮ শতাংশ। বাংলাদেশী কার্ড ব্যবহার করে ব্যয়ের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে মালয়েশিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস। তবে কার্ডের ধরন অনুযায়ী, ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ব্যয়ে শীর্ষ দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশীরা সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছেন চীনে। আর প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে ব্যয়ের শীর্ষ দেশ ছিল যুক্তরাজ্য।
এক বছর আগের তুলনায় চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশী ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে ভারতে ব্যয় ৬৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ কমেছে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, ২০২৪ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশী ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে ভারতে ব্যয় ছিল ৯৮ কোটি টাকা। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিলে এ লেনদেন মাত্র ৩১ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
প্রতিবেদনে বিদেশী কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে ব্যয়ের তথ্যও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, গত এপ্রিলে বিদেশী কার্ডধারীরা বাংলাদেশে ২৬২ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ১০৮ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কার্ডধারীরা। এক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য ও ভারতের কার্ডধারীদের অবস্থান ছিল যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লেনদেন ব্যবস্থায়ও আধুনিকায়ন হচ্ছে। এ কারণে গত কয়েক বছরে দেশে কার্ডভিত্তিক লেনদেন দ্রুত বাড়ছে। দেশের অভ্যন্তরে লেনদেনের পাশাপাশি বাংলাদেশী উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের বড় অংশ বিদেশ ভ্রমণের সময় কার্ড সঙ্গে নিচ্ছেন। আগে দ্বৈত মুদ্রায় (বাংলাদেশী ও বিদেশী) লেনদেনে কেবল ক্রেডিট কার্ডের প্রচলন ছিল। কিন্তু এখন বেশির ভাগ ব্যাংকের ডেবিট কার্ডও দ্বৈত মুদ্রায় ব্যবহার করা যাচ্ছে। আর প্রিপেইড কার্ডের জনপ্রিয়তাও দিন দিন বাড়ছে। বিদেশী যাত্রার সময় অনেক বাংলাদেশীই এখন প্রিপেইড কার্ড সঙ্গে নিচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগে বাংলাদেশীদের সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য ছিল ভারত। কিন্তু ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ভারতের পক্ষ থেকে ভিসা জটিলতার কারণে বাংলাদেশীরা এখন ভ্রমণ ও চিকিৎসার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যে যাচ্ছেন। এ কারণে ভারতে বাংলাদেশী কার্ডের ব্যবহার কমে গেছে। একসময় বিদেশে ব্যবহারের জন্য কেবল ক্রেডিট কার্ড নিতে হতো। কিন্তু এখন ডেবিট কার্ডও দ্বৈত মুদ্রায় ব্যবহার করা যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এনবিআর কর্তৃক আয়কর রিটার্ন দাখিলের শর্তারোপের কারণে দেশের বাজারে ক্রেডিট কার্ড সম্প্রসারণ অনেকটাই থমকে গিয়েছিল। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ শর্ত তুলে নেয়া হয়েছে। আশা করছি, এতে ক্রেডিট কার্ডের বাজার দ্রুত সম্প্রসারণ হবে। মানুষ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে লেনদেন বেশি করলে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতাও বাড়বে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশের ব্যাংকগুলোর ইস্যুকৃত কার্ডের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪০ শতাংশ। একই সময়ে কার্ডভিত্তিক লেনদেনে ২২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২০ সালের মে মাসে ব্যাংকগুলোর ইস্যুকৃত মোট কার্ড ছিল ২ কোটি ১৫ লাখ ৯৩ হাজার ৮২৮টি। এর মধ্যে ১ কোটি ৯৪ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০টি ছিল ডেবিট কার্ড। আর ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ড ছিল যথাক্রমে ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ৩৬০ ও ৫ লাখ ৫২ হাজার ৯৮টি। চলতি বছরের এপ্রিল শেষে মোট কার্ড সংখ্যা ৫ কোটি ১৭ লাখ ১৮ হাজার ৩৭৮টিতে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ডেবিট কার্ডের সংখ্যাই ৪ কোটি ১৫ লাখ ৭ হাজার ২৪। ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ৭৫ হাজার ৫০১-এ। তবে এ পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রিপেইড কার্ডে। বিশেষ ধরনের এ কার্ডের সংখ্যা এখন ৭৬ লাখ ৩৫ হাজার ৮৫৩টিতে দাঁড়িয়েছে।
পাঁচ বছর আগে ২০২০ সালের মে মাসে দেশে কার্ডভিত্তিক লেনদেন ছিল মাত্র ১২ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের এপ্রিলে কার্ডের মাধ্যমে ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকাই লেনদেন হয়েছে ডেবিট কার্ডে। দেশের ৬২টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৫৬টি ব্যাংক কার্ড সেবা চালু করেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, বর্তমানে ৪৮টি ব্যাংক গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ড, দ্বৈত মুদ্রার ডেবিট কার্ড ও প্রিপেইড কার্ড প্রস্তাব করছে। এর পাশাপাশি দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের ক্রেডিট কার্ড বাজারে বেশ জনপ্রিয়।